কেমন আছে এরশাদ শিকদারের স্বর্ণকমল : কেমন আছে তার পরিবার


খুলনার ঘাট এলাকার ভয়ংকর সন্ত্রাসী এরশাদ আলী শিকদার ওরফে এরশাদ শিকদার আজ নেই। ২০০১ সালের ১০ মে ফাঁসির রশিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয় একাধিক হত্যাসহ ৩২ মামলার আসামী এরশাদ শিকদারের। সে না থাকলেও রয়েছে তার বহুল আলোচিত ৩৫ নম্বর “স্বর্ণকমল” নামের বাড়িটি। এরশাদ শিকদার একজন জঘন্য প্রকৃতির লোক হলেও তার বাড়িটি তৈরীর পর থেকেই খুলনাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফাঁসির রশিতে এরশাদের মৃত্যুর সাথে সাথে স্বর্ণকমলের আলোচনাও স্থিমিত হয়ে যায়। তারপরও বিলাস বহুল এই বাড়িটি আজও মানুষকে মনে করিয়ে দেয় পৈশাচিক একজন খুনীর বিলাসী মনোভাবের কথা।

কিন্তু সোনাডাঙ্গা থানার মজিদ স্মরনির এই বাড়িটি যে তৈরী করেছিলো তাকেও,জীবন দিতে হয় শিকদারের হাতে। অপরাধ ছিলো বাড়িটির নির্মাণের সময় কিছু অংশ অন্যের জমিতে এক ইঞ্চি ঢুকে যাওয়া। এই বাড়িতে এখন বসবাস করছে এরশাদের দুই ছেলে আর ছেলেদের স্ত্রীরা। সূত্রে জানা যায়, এরশাদ শিকদার জীবিত থাকাকালে চোরাচালানী, জবর দখল ও চাঁদাবাজী করে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করে। উপার্জিত সেই টাকা সে ব্যাংকে রাখার পাশাপাশি দাদন ব্যবসা, জমি ক্রয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতাকে ধার দিয়ে রাখে। সোনাডাঙ্গা থানার মজিদ স্মরনীতে তৈরী করে বিলাশ বহুল বাড়ি “স্বর্ণকমল”।
কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়ায় ধরাকে সরা জ্ঞান করতে থাকে এরশাদ। অবৈধভাবে উপার্জিত টাকায় স্বর্ণকমলে বিলাশী জীবন যাপন করতে থাকে এরশাদের দুই স্ত্রী খোদেজা বেগম ও সানজিদা নাহার শোভা, তিন ছেলে মনিরুজ্জামা জামাল, কামাল ও হেলাল, মেয়ে সুবর্না ইয়াসমিন সাদ। কোন কিছুর অভাব না থাকলেও তারা বাইরের জগতের সাথে খুব বেশী মিশতে পারেনি এরশাদের কারনে। স্বর্ণকমলের নিয়ন্ত্রন ছিলো খোদেজা ও শোভার হাতে। দুই তলা বাড়ির নিচতলার বাসিন্দা ছিলো ছোট স্ত্রী শোভার দখলে আর উপরের তলা খোদেজা বেগমের।

খোদেজা সেখানে তার ছেলে মেয়ে ও মাকে নিয়ে বসবাস করতো। এরশাদ তার উপার্জিত অর্থের কিছু অংশ তার দুই স্ত্রীর নামেই ব্যাংকে জমা রেখেছিলো বলে সে সময় জানা যায়। কারন সব সময় এরশাদ বাড়িতে থাকতে না পারায় সংসার পরিচালনার জন্য স্ত্রীদের নামে টাকা রাখে সে। এরশাদের ভাষায় কিছু টাকা হলেও তার পরিমান কয়েক কোটি টাকা বলে একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়। বাকি টাকা এরশাদ নিজেই নিয়ন্ত্রন করতো। এরশাদ ধরা পড়ার পরও তার দুই স্ত্রী কিছুদিন একসাথে বসবাস করেছে। কিন্তু এরশাদের ফাঁসির পরই শুরু হয় স্বর্ণকমল নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিবাদ। এরশাদের বোন ও ভাইয়েরা এই স্বর্ণকমলের দাবি করে বলেও সে সময় প্রচার হয়। কিন্তু বাইরের কেই ভিতরে ঢুকতে না পারায় তাদের সেসব কথা খুব বেশী বাইরে আসেনি। পরবর্তীতে এরশাদের বোনেরা বাড়ির ভাগ নেয়া থেকে বিরত থাকে।

১৯৯৮ সালে এরশাদ ধরা পড়ার পর তার এবং তার স্ত্রী সন্তানদের নামে থাকা (জ্ঞাত) সব ব্যাংক একাউন্ট বন্ধ করে দেয় সরকার। হাতে থাকা টাকা দিয়েই চলতে হয় স্বর্ণকমলের বান্দিাদের। এরশাদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর তার প্রথম স্ত্রী খোদেজা বেগম তার স্বামীর (এরশাদ) সহযোগি জাহাজী মতিকে বিয়ে করে কয়েক কোটি টাকা নিয়ে খুলনা ছেড়ে চলে যায় ঢাকায়। ছোট স্ত্রী সানজিদা নাহার শোভাও চলে যায় ঢাকা। সেখানে বিউটি পার্লার স্থাপন করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। দুই স্ত্রী চলে গেলেও এরশাদের সন্তানরা থেকে যায় স্বর্ণকমলে। বাবার কারণে তাদের ছেলেরা বাইরে বের হতে না পারায় সে সময় অর্থ কষ্টে পড়তে হয় তাদেরকে। এরশাদ শিকদার না থাকলেও রয়েছে তার বহুল আলোচিত ৩৫ নম্বর “স্বর্ণকমল” নামের বাড়িটি। এরশাদ শিকদার একজন জঘন্য প্রকৃতির লোক হলেও তার বাড়িটি তৈরীর পর থেকেই খুলনাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় ব্যাপক আলোচনার ঝড় উঠে। তারপরও বিলাশ বহুল এই বাড়িটি আজও মানুষকে মনে করিয়ে দেয় পৈশাচিক একজন খুনীর বিলাশী মনোভবের কথা।

এই বাড়িতে এখন বসবাস করছে এরশাদের দুই ছেলে আর ছেলেদের স্ত্রীরা। বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার মাদার ঘোনা গ্রামের বাসিন্দা দরিদ্র মৃত বন্দে আলী শিকদারের ৮ ছেলে মেয়ের (৪ ছেলে ও ৪ মেয়ে) মধ্যে দ্বিতীয় এরশাদ। ছোট বেলায় দারিদ্রের কারণে ৭/৮ বছর বয়সে চলে আসে খুলনার ৫ নম্বর ঘাট এলাকায়। ছোট বেলায় থেকেই ঘাটের সরকারী বার্জ কার্গো ও ট্রেনের ওয়াগন থেকে চাল, গম, সার চুরি করতে করতে এক সময় চোরের সর্দার বনে যায়। তার নাম দেয়া হয় রাঙ্গা চোর। চুরি করতে গিয়ে একাধিক বার ধরা পড়েছে, কিন্তু চুরি করা ছাড়েনি। এক সময় চোরের সর্দার বনে যায় সে। এরপর চুরির এলাকার পরিধি বাড়িয়ে যায় সে।

চাল গম চুরি করতে করতে শুরু করে রেলের পাটি, তেলসহ অন্যান্য সামগ্রী চুরি। যা ছিলো এরশাদের অর্থের মূল উৎস। চোরাই মালামাল বিক্রির টাকা দিয়ে শুরু করে ব্যবসা। বড়ভাই আশরাব আলী শিকদার তাকে (এরশাদকে) মাছের ব্যবসা করার জন্য ১৯৭৪ সালে একটি ট্রলার ও ২২টি জাল দিয়ে সহায়তা করে। ব্যবসার মধ্যে চুরির কাজ সে ঠিকমতই চালিয়ে যায়। এর মাধ্যমেই সে কোটি কোটি টাকা ও বিপুল পরিমান সম্পদের মালিক বনে যায়। ১৯৯৬ সালে খুলনা মহানগরীর মজিদ স্মরণীর স্বর্ণকমলের জন্য ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ছয় কাটা জমি কিনে সেখানে তৈরী করে বিলাশ বহুল দুই তলা বাড়ি। যার নাম দেয়া হয় স্বর্ণকমল। বাড়ি বানানোর সব মালামাল ভারত থেকে আনে এরশাদ। নকশাও ভারতীয় একটি বিলাশ বহুল বাড়ির। যা সে ভারতে গিয়ে এনেছিলো বলে সে ধরা পড়ার পর জানা যায়।

কিন্তু এই বাড়ির কারনে মাস্টার জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে মেরে ফেলে এরশাদ। তার অপরাধ ছিলো নকশায় সামান্য পরিবর্তন করা, এতে করে অন্যের জমির মধ্যে এক ইঞ্চি পরিমান চলে যায় বাড়ির একটি অংশ। ফলে আরও কয়েক কাঠা জমি অধিক দামে কিনতে হয় এরশাদকে। বাড়ির ভেতর পেচানো সিড়ি দিয়ে উঠে যেতে হয় দোতলায়। পিছনেও রয়েছে একটি সিড়ি। যা ব্যবহার হতো পালানোর জন্য। দোতলায় একটি বাংকার তৈরী করেছিলো এরশাদ। পরবর্তীতে সেখান থেকে একটি বিদেশী বন্দুক ও একটি পিস্তল উদ্ধার করে পুলিশ। বাড়ির প্রত্যেকটি ঘর সাজানো হয়েছিলো দামিদামি সব আসবাব পত্র ও শোপিস দিয়ে। সিড়ির দেয়ালে দামী কাঠ দিয়ে করা হয় চমৎকার নকশা।

তৈরীর আগে থেকেই আলোচনার বিষয়ে পরিনত হয়েছিলো স্বর্ণকমল। সমাপ্ত হওয়ার পর তা পরিনত হয়েছিলো দর্শণীয় বস্তুতে। যা দেখার জন্য অনেক দূরদূরান্ত থেকে লোকজন এসেছে খুলনা শহরে। এমনকি বিদেশী পর্যটকরাও স্বর্ণকমলের সামনে গিয়ে একবারের জন্য হলেও বাড়িটি দেখেছেন। তবে এরশাদ ওই বাড়িতে বেশী দিন থাকতে পারেনি। পুলিশের অভিযানের মুখে প্রায় সময় তাকে কাটাতে হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। ১৯৯৮ সালের ১১ আগষ্ট ধরা পড়ার পর সেখানে আর যেতে পারেনি এরশাদ।

এরশাদ না থাকলেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার দুই স্ত্রী খোদেজা বেগম ও সানজিদা নাহার শোভা, তিন ছেলে মনিরুজ্জামান জামাল, কামাল ও হেলাল, মেয়ে সুর্বনা ইয়াসমিন সাদ, খোদেজার মা ও একাধিক কর্মচারী বসবাস করেছে স্বর্নকমলে। কিন্তু এখন সেখানে থাকে জামালের স্ত্রী। জামাল ব্যবসার কারনে অধিকাংশ সময় ঢাকায় অবস্থান করে। কামাল স্বর্ণকমলের বিপরীতে একটি চার তলা বাড়ির বাসিন্দা। এরশাদ শিকদারের ফাঁসির পর তার ছেলেরা বাড়ির দোতলায় মুরগীর ফার্ম করে। সে সময় এটাই ছিলো তাদের আয়ের একমাত্র উৎস।

সংকট নিরসনে স্বর্ণকমলের দোতলার এক পাশে মুরগীর ফার্ম, বাড়ির সামনে ফ্যাক্স ফোনের দোকান স্থাপন করে তারা। কিন্তু পরবর্তীতে জামাল তার শ্বশুরের সাথে জমির ব্যবসা শুরু করে। কামাল স্বর্ণকমলের সামনে চার তলা বাড়ির ভাড়া আদায়সহ বড় বাজারের কয়েকটি দোকানের ভাড়া দিয়ে এবং ছোটখাটো ব্যবসা করে। হেলালও বড়বাজারের দোকান থেকে ভাড়া আদায় করে সেই টাকা দিয়ে চলছে বলে একাধিক সূত্র জানায়। বর্তমানে এভাবেই চলছে খুনী এরশাদ শিকদারের।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*