স্বামীকে আমি আর সহ্যই করতে পারছি না। কারণ সে আমাকে আর শান্তি…


জীবন থাকলে সম্পর্ক থাকবেই। আর সম্পর্ক থাকলে থাকবে সমস্যা। প্রতিদিন ফেসবুকের ইনবক্সে ও ই-মেইলে আমরা অসংখ্য সম্পর্ক ভিত্তিক প্রশ্ন পাই, যেগুলোর কথা হয়তো কাউকেই বলা যায় না। পাঠকদের করা সেইসব গোপন প্রশ্নের উত্তর দিতেই আমাদের নিয়মিত আয়োজন “প্রিয় সম্পর্ক”। আর সম্পর্ক ভিত্তিক সেই প্রশ্নগুলোর উত্তরে পরামর্শ দিচ্ছেন গল্পকার রুমানা বৈশাখী,

আপনি চাইলে নিজের এমনই কোন একান্ত ব্যক্তিগত সমস্যার কথা লিখে জানাতে পারেন আমাদের। আমরা প্রতিদিন চেষ্টা করবো বাছাইকৃত কিছু সমস্যার সমাধানে কাঙ্ক্ষিত পরামর্শটি দেবার। সমস্যার কথা লিখে জানান আমাদের ফেসবুক পেজের ইনবক্সে। নাম গোপন রাখতে চাইলে লিখে দেবেন “নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক”।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানিয়েছেন নিজের সমস্যার কথা।

“আমার বিয়ে হল এক বছর হয়ে গেছে। আজো আমি বুঝতে পারিনি আমার স্বামী আমাকে পেয়ে আসলে খুশি কিনা। আমাকে প্রথম দেখার দিন সে তার প্রাক্তন প্রেমিকার কথা বলে, আমি মেনে নেই। কারণ এ যুগে প্রেম থাকতেই পারে। কিন্তু বিয়ের পর বড় একটা ধাক্কা খাই। ওই মেয়েটার সাথে ওর বিয়ের পরও যোগাযোগ ছিলো। মেয়েটির বিয়ে হয়েছে ৩ বছর। মেয়েটি হিন্দু এজন্য অন্যত্র বিয়ে করে। ওই মেয়েটির স্বামী বিদেশে থাকে। আর ঐ মেয়ে ছলাকলা দিয়ে ওকে হাত করে রেখেছিলো। বুঝলাম এভাবে যে সে তার স্বামীকে দিয়ে প্রিপেইড কার্ড আনিয়েছিলো ওর সাথে কথা বলার জন্য, সে নাকি তার স্বামীর সামনে থেকেই ওর সাথে কথা বলেছিলো। কিন্তু সে যে তার প্রাক্তন প্রেমিক এটা কখনও বলেনি আর স্বামীর সাথে কখনো কথাও বলিয়ে দেয়নি।

আমার স্বামী ঐ মেয়েকে এভোয়েড করতে গেলে সে বলতো স্বামী নির্যাতন করে, বউ বলে গন্য করে না হ্যান ত্যান ইত্যাদি। ওর মুখে দুইবার দুই কথা শুনেছি। আর এই মেয়ের প্রশ্ন উঠেছে যখন বলে ঐ মেয়ে তার সাথে দেখা করবে বলে আর দেখা করেনি। এতেই তার অভিমান। ঐ মেয়ের প্রতি অসংখ্য দুর্বলতা আমি দেখেছি ওর মধ্যে। একবারও বলেনা যে, ও গিয়েছে তো কি হয়েছে, আমি তোমাকে পেয়েছি।

ওই মেয়ের সাথে আমার কথা হয়েছে। সে মেয়ে বলে যে, “আপনার স্বামীই তো আমাদের সম্পর্কের কথা আপনাকে বলেছে। তাহলে যোগাযোগ থাকাতে আপনি প্রশ্ন করছেন কেন?” আর আমার স্বামীও ঐ একই কথা বলে যে, “আমি প্রথম দিনই বলেছি ওর কথা। তাহলে?”

আমার স্বামী এ কথাও বলে যে, সে আমার প্রাক্তন প্রেমিকা। সে তো তোমার সাথে ভাব নিবেই! আমি কথা বন্ধ করে দেই। আমি আর স্বামীকে সহ্য করতে পারি না। স্বামী বলে ও নাকি এখন আর কথা বলেনা। আদৌ কথা বলে কিনা জানিনা। জানবো কি করে, আমি তো এখন সতর্ক হয়ে গেছি। এখন স্বামী আমার চোখের বিষ। কোন আগ্রহ নেই এই পরিবারের প্রতি। ইচ্ছে করে জব করার পর সব টাকার হিসেব মিটিয়ে ওর মুখে ছুঁড়ে চলে যাই। কোন ইচ্ছে নেই আমার।

ঐ মেয়ে ছাত্রী থাকাকালীন সময়ে ওকে টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলো। এজন্য ওর এত দুর্বলতা। মেয়েরা ছেলেদের পকেট খালি করে আর ঐ মেয়ে ওর পকেট খালি তো করেনি, কখনো উলটো দেখা করলে খাইয়েছে। আর আমি তো স্ত্রী। আমি তো ওর অন্ন ধ্বংস করতে এসেছি। আরো অনেক কথা বলে স্বামী যা বলে শেষ করা যাবেনা। ঐ মেয়ে অন্য জেলার হওয়াতে ওদের কমই দেখা হত, কিন্তু যখন হত তখন নাকি ওরা অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটাতো। ওনেক কিছু করার সুযোগ ছিলো কিন্তু হয়নি। ঐ মেয়ে আমাদের এঙ্গেজমেন্টের পর থেকে ওকে কল করে প্রতিনিয়ত বলতে থাকে, “এই মেয়ে আমার মত হবেনা। আমার মত ভালো না। আমার মত সুন্দর না। আর সে ওকে ছেড়ে গিয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন স্বামী পেয়েছে। কিন্তু আমার স্বামী পেয়েছে বাজে দেখতে, বোকা স্ত্রী। কেবল একটা দিকই পেয়েছে যে একই প্রতিষ্ঠানের ছাত্রী।”

আমার স্বামী এর প্রতিবাদ করেনি। দু একবার বলেছিলো সে সন্তুষ্ট। তখন ওই মেয়ে বলে এগুলো কু-যুক্তি। আমার স্বামী ওর সাথে কথাগুলো যথেষ্ট নরম স্বরে বলে, কিন্তু বিয়ের পুর্বে আমি প্রচুর কল ওয়েটিং পাই। এগুলো শুনি ওর মোবাইলে রেকর্ড থেকে। আমার স্বামী ইচ্ছে করেই আমাদের বিয়ের বাজে ছবিগুলো ফেসবুকে দেয়। ওই মেয়ের সাথে যে তার ঘনিষ্ঠতা তা আমি একদিন অনেক সকালে কল করে বুঝি। ও নিজেই কল ব্যাক করতো। আর ঐ প্রেমিকার কথা উঠলে বলতো তুমি তো বোকা। নিজের সুখ নষ্ট করছো। যে আমাকে বাসরের দিন থেকেই বলছে ওই মেয়েকে ভুলতে পারেনি তার কাছ থেকে কি সুখ আশা করতে পারি বলুন?

ও যথেষ্ট রাগী ও বদমেজাজি। অথচ ঐ মেয়ের সাথে ও যথেষ্ট নরম স্বরে কথা বলে। এটা নিয়ে প্রশ্ন তুললে ও মিটমাট করতে ওর যে বন্ধুকে আনে, সে উলটো আমাকে বলে প্রেমিকা আর বউ এক না। ওর প্রতি টান থাকবেই কারণ না পাওয়া জিনিস। ও নিজেও একদিন একই কথা বলে।

আমি পড়তেও পারছিনা। ইচ্ছে আছে জব করলে তো আলাদা থাকবো তখন ওর থেকে স্বরে যাবো। মা বাবা ডিভোর্সের পক্ষপাতি না। ওর প্রতি শারীরিক, মানসিক কোন আকর্ষণ নেই আমার। আর কোন পছন্দের মানুষও নেই যে ওকে ছেড়ে তার কাছে যাবো। আমি আর ওকে নিয়ে ভাবতে পারিনা। ও বলে, ঐ মেয়ে দিনে ৫০বার কল দেয়। তাই বিরক্ত হয়ে কথা বলে। কিন্তু কল রেকোর্ডিংস এ আমি কোন বিরক্তি খুঁজে পাইনা।

জীবনের প্রতি আর কোন আগ্রহ নেই আমার। ঐ মেয়েকে নিয়ে একেকবার সে একেক কথা বলে। আমি এটা বুঝি যে ঐ মেয়ের প্রতি সে খুবই দুর্বল। আমি কী করবো বলুন?”

পরামর্শ:

দেখুন আপু, আপনি যখন স্বামীকে আর সহ্যই করতে পারছেন না এবং তার প্রতি কোন আকর্ষণ বোধ করছেন না, তাহলে বাকি সব কথা বলাই বৃথা। কারণ আপনার দিক থেকে তো সম্পর্কটি মরে গেছে, তাই না? তাছাড়া সত্যি বলতে কি, আমার মনে হয় না স্বামী সেই মেয়েটিকে ভুলতে পেরেছেন বা কখনো পারবেন। মেয়েটিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আপনার স্বামী তার প্রেমিক, স্বামীর মনের ওপরে দখল ওই মেয়েটিই করে রেখেছে। তাঁরা দুজনের কেউই পরস্পরকে ভুলতে পারেনি। এবং অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে তাঁরা সেই চেষ্টাও করেনি।

আরেকটি কথা কি আপু, মানুষ বিয়ের পর প্রাক্তন প্রেমকে তখনই ভুলতে পারে, যখন কিনা বর্তমানের স্বামী বা স্ত্রীর সাথে তাঁরা সুখী হয়। বর্তমানের মানুষটির প্রেমে ডুবে গিয়ে প্রাক্তন প্রেমকে ভুলে যাওয়া সম্ভব হয়। আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে স্বামী আপনাকে দায় ঠেকে বিয়ে করেছে। প্রেমিকার বিয়ে হয়েছে, তাই নিজে একটি বিয়ে করতে হয় বলে করেছে। ব্যাপারটা লোক দেখানো। আপনার প্রতি তেমন কোন আগ্রহ তার মাঝে দেখতে পাচ্ছি না। আগ্রহ থাকলে প্রেমিকার প্রতি এত দুর্বলতা থাকত না।

আপনার যখন মনই উঠে গেছে, ডিভোর্স দেয়াটাই ভালো হবে। আপনার মা বাবাকে বলুন যে আপনি আর থাকতে চাইছেন না, স্বামীর পরকীয়া আছে। তাছাড়া আপনি প্রাপ্ত বয়স্কা, চাইলে নিজেই ডিভোর্স দিতে পারবেন। এই সম্পর্কে থাকতে না চাইলে সেটা ঠেকে বের হয়ে যান। জীবন নতুন ভাবে শুরু করুন। আর যদি থাকতেই চান, তাহলে মেয়েটির অস্তিত্ব স্বামীর জীবনে মেনে নিয়েই সামনে যেতে হবে। ব্যাপারটা সম্ভবত অনেক কঠিন হবে আপনার জন্য। অন্তত আমি আপনার স্থানে হলে এই বিষয়টি কিছুতেই মেনে নিতে পারতাম না।

বিশেষ দ্রষ্টব্য

আমি কোন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক বা আইনজীবী নই। কেবলই একজন সাধারণ লেখক আমি, যিনি বন্ধুর মত সমস্যাটি শুনতে পারেন ও তৃতীয় ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু পরামর্শ দিতে পারেন। পরামর্শ গুলো কাউকে মানতেই হবে এমন কোন কথা নেই। কেউ যদি নতুন কোন দিক নির্দেশনা পান বা নিজের সমস্যাটি বলতে পেরে কারো মন হালকা লাগে, সেটুকুই আমাদের সার্থকতা।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*